সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ খাতে অর্থায়ন সহজ করতে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছে।

পাশাপাশি নেট মিটারিং ব্যবস্থায় উৎপাদিত অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে প্রণোদনাসহ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনাময় খাত নয়, বরং সময়ের অনিবার্য বাস্তবতা।

সরকারের লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নীতি সহায়তা, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির আমদানি এবং দেশীয় উৎপাদনেও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশকে আমদানিনির্ভর করে ফেলার কারণে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকার ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেলের মজুত বাড়ানো, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় সময় নষ্ট না করে ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ চাহিদা কীভাবে পূরণ করা যায়, বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কীভাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, সেটিই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সোলার এক্সপোতে তিন শতাধিক তরুণ-তরুণী উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করেছেন। তাদের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে চলতি বাজেটে স্টার্টআপ খাতে বছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থের অভাবে যেন কোনো তরুণের উদ্ভাবনী ধারণা হারিয়ে না যায়, সরকার তা নিশ্চিত করতে চায়।

তিনি আরও বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে সরকার ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এ খাতে অর্থায়ন ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি খাতেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পকে সৌরচালিত পাম্পে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে এবং পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।

সৌরবিদ্যুৎ খাতের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পর এর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোকে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তাঁদের সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হতে হবে।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকার, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সোলার এক্সপো যেন কেবল দুই দিনের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং এখান থেকে নতুন উদ্যোক্তা, বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

আসন্ন দিনগুলোতে সৌরবিদ্যুৎকে দেশের অন্যতম জ্বালানি উৎস হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।