কোলেস্টেরল হলো মোমের মতো একটি চর্বিজাতীয় পদার্থ। এটি শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রয়োজন হয়। শরীর নিজেই প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরলের বেশির ভাগ তৈরি করে নেয়। আবার, খাবার থেকেও কিছু কোলেস্টেরল পাওয়া যায়। 

তবে রক্তে এর মাত্রা বেড়ে গেলে তা ধমনীর দেয়ালে জমা হয়ে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, যা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৭৬% থেকে ৮০% মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ডিসলিপিডেমিয়া বা কোলেস্টেরলের সমস্যায় ভুগছেন।

রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কোনো বিকল্প নেই। তবে অনেকেই কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন ওষুধ খেয়ে থাকেন। কোলেস্টেরলের ওষুধ বিশেষ করে স্ট্যাটিন, অনেক মানুষের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। তবে এ ধরনের ওষুধের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ শুরু করা বা বন্ধ করা আপনার জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

অনেকে কয়েক মাস ওষুধ খাওয়ার পর রিপোর্ট ভালো আছে ভেবে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। আবার, অনেকে ভাবেন সারাজীবন এই ওষুধ খেলে কিডনি বা লিভার নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই ওষুধ বন্ধ করে দেন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহনাজ চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি ভিডিওতে, স্ট্যাটিন জাতীয় ওষুধ খাওয়ার সময় কয়েকটি বিষয় অবশ্যই বিবেচনা করতে বলেছেন। যেমন-

নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করবেন না
এটি সবচেয়ে বড় ভুল। স্ট্যাটিন খেয়ে কোলেস্টেরল স্বাভাবিক আছে মানেই রোগের ঝুঁকি কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। অনেক সময় ওষুধের কারণেই কোলেস্টেরল স্বাভাবিক থাকে। তাই কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।

নিয়মিত ওষুধ খান
প্রতিদিন নিয়মিত একই সময়ে ওষুধ খেতে হবে। এক দিন খেয়ে দুদিন বাদ দিলে হবে না। আবার, একেকদিন একেক সময়ে খাওয়াও ঠিক না। তাই প্রতিদিন একই সময়ে ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস করুন।

শুধু ওষুধের ওপর ভরসা করবেন না
অনেকে ভাবেন ওষুধ তো খাচ্ছি, যা খুশি তাই খেতে পারি, কোনো সমস্যা নেই। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। শুধু ওষুধের ভরসায় থাকলে চলবে না। এর পাশাপাশি কম স্যাচুরেটেড ফ্যাট, শাকসবজি, মাছ, ওটস, অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামও জরুরি।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন
ওষুধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করলে আরও ভালো উপকার পাওয়া যায়। প্রতিদিন নিয়ম করে সকালে হাঁটার অভ্যাস করুন। সময় বের করে হালকা ব্যায়ামও করতে পারেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে না থেকে শরীরকে সচল রাখার চেষ্টা করুন।

নিয়মিত ফলো আপ করুন
নির্দিষ্ট সময় পরপর চিকিৎসকের কাছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যান। লিভারে কিছু পরীক্ষাও করা লাগতে পারে। তবে সবার যে একই পরীক্ষা বারবার করতে হবে, এমনটা না। ব্যক্তিভেদে পরীক্ষার ধরন আলাদা হতে পারে। এটা আপনার চিকিৎসক বলে দেবেন।

পেশিতে অস্বাভাবিক ব্যথা
পেশিতে অস্বাভাবিক ব্যথা হলে চিকিৎসককে জানাবেন। যদি পেশিতে তীব্র ব্যথা, দুর্বলতা এবং এর সঙ্গে গাঢ় রঙের প্রস্রাব হয় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

অন্য ওষুধ শুরু করলে চিকিৎসককে জানান
অন্য কোনো ওষুধ শুরু করলেও চিকিৎসককে জানাতে হবে। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিফাংগাল জাতীয় ওষুধ এবং আরও কিছু ওষুধ স্ট্যাটিনের সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়া করতে পারে। তাই নতুন ওষুধ শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসককে জানাতে হবে যে আপনি কোলেস্টেরল এর ওষুধ খাচ্ছেন।

গ্রেপফ্রুট সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করুন
গ্রেপফ্রুট সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কিছু গ্রেপফ্রুটের সঙ্গে স্ট্যাটিন জাতীয় ওষুধ খেলে ওষুধের মাত্রা শরীরে বেড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশে এটি খুব বেশি প্রচলিত না হলেও যারা খান, তারা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।

গর্ভাবস্থায় সতর্ক থাকুন
অন্তঃসত্ত্বা হলে অবশ্যই চিকিৎসককে জানাতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন স্ট্যাটিন ব্যবহার করা যাবে কি না।

মনে রাখবেন, এই ওষুধের উদ্দেশ্য শুধু কোলেস্টেরল কমানো না। স্ট্যাটিনের প্রধান লক্ষ্য হলো হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও অন্যান্য হৃদরোগজনিত রোগের জটিলতার ঝুঁকি কমানো।

যে ভুলগুলো করবেন না
• ইউটিউব দেখে ওষুধ বন্ধ করে দেবেন না।

• ভেষজ ওষুধ দিয়ে স্ট্যাটিনের বিকল্প করার চেষ্টা করবেন না।

• আমার তো কোনো উপসর্গ নেই, তাই ওষুধের দরকার নেই,এমনটাও ভাববেন না।

কোলেস্টেরল বেশি হলে সাধারণত কোনো ব্যথা বা লক্ষণ থাকে না। তাই অনেকে মনে করেন, আমি তো ভালোই আছি, তাই ওষুধ বন্ধ করে দেই। হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের আগ পর্যন্ত অনেকে কোনো লক্ষণ অনুভব করেন না। তাই স্ট্যাটিনের সাফল্য হলো, আপনি অসুস্থ বোধ না করেই ভবিষ্যতের শঙ্কা কমিয়ে রাখছেন। একারণেই চিকিৎসক যখন এই ওষুধ দেন, তখন তার লক্ষ্য শুধু আজকের রিপোর্ট ভালো করা না, আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের জন্য আপনার হৃদস্বাস্থ্যকে রক্ষা করা।

স্ট্যাটিন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গবেষণা করা ওষুধগুলোর একটি। সঠিক রোগের ক্ষেত্রে এটি জীবন বাঁচাতে পারে। তবে সর্বোচ্চ উপকার পেতে হলে ওষুধ নিয়মিত খাওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা জরুরি।