ভারতের ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন বা এনআরসির নামে ১৩ কোটির বেশি ভোটারকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ফের উত্তাল নয়াদিল্লি। রোববার কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোটের ডাকে ভারতের রাজধানী শহরটি কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

লাখ লাখ মানুষ জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেন। সমাবেশ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও কঠোর সমালোচনা হয়েছে। মোদিকে সতর্ক করে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, ‘আপনি কোথাও পালানোর সুযোগ পাবেন না।’

দিল্লির ঐতিহাসিক রামলীলা ময়দানে ইন্ডিয়া জোটের এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে এ কর্মসূচিতে কংগ্রেসসহ জোটের বিভিন্ন শরিক দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। সমাবেশকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা মিছিল নিয়ে জড়ো হতে শুরু করেন। সূত্র জানায়, সমাবেশ স্থল ছাড়িয়ে আশপাশের পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। লাখো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।

সমাবেশের আগে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের বাসভবনে একে একে পৌঁছান প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ফারুক আবদুল্লাহ, এনসিপির সুপ্রিয়া সুলে ও কেরালার কংগ্রেস নেতা ভি ডি সতীশনসহ বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা। সেখান থেকে তারা মিছিল করে রামলীলা ময়দানে যান। সমাবেশে অংশ নেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও।

জ্ঞানেশকে সরিয়ে জেলে পাঠানোর হুঁশিয়ারি রাহুলের : রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোটের সমাবেশ থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনসহ একাধিক নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। সে সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সতর্ক করে রাহুল বলেন, নিজেদের যতই শক্তিশালী মনে করুন না কেন, তারা সংবিধানের চেয়ে বড় নন। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, মোদিকে কঠোর বার্তা দিয়েছেন রাহুল গান্ধী। সমাবেশে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আপনি কোথাও পালানোর জায়গা পাবেন না।’

রোববার দিল্লির রামলীলা ময়দানে আয়োজিত বিরোধী জোটের সমাবেশে রাহুল বলেন, জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরানোর পর তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হবেন মোদি ও শাহ। তার অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সহযোগিতা ছাড়া নরেন্দ্র মোদির পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়া এবং অমিত শাহের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়া সম্ভব হতো না। রাহুলের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ। তার দাবি, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রায় ১৫ শতাংশ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টিকে সাধারণ অনিয়ম হিসাবে দেখতে নারাজ তিনি। তার ভাষায়, এটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল এবং অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের নির্বাচনেও পরিকল্পিতভাবে ভোট চুরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন রাহুল।

এর আগে কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, রামলীলা ময়দান ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যে দিল্লি পুলিশের প্রায় তিন হাজার সদস্য এবং আধাসামরিক বাহিনীর সাত হাজারের বেশি সদস্য রয়েছেন। অতিরিক্ত ১০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনীও প্রস্তুত রাখা হয়।

ভোটে হারিনি, হারানো হয়েছে-মমতা : ভোট চুরি করে গণতন্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার সমাবেশ থেকে এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সে সঙ্গে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করে তার পদত্যাগের দাবিতে সরব হন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী। দিল্লির সমাবেশে মমতা বলেন, ‘আমরা হারিনি, আমাদের হারানো হয়েছে। ভোট লুট করেছে বিজেপি, দেশের গণতন্ত্রকে হরণ করেছে।’ তার অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নামে লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তার দাবি, রাজ্যে এক কোটিরও বেশি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে আক্রমণ করে মমতা বলেন, শুধু ভোট নয়, গণনার প্রক্রিয়াও কার্যত অদৃশ্য করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি একসঙ্গে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে। এনআরসিকে কটাক্ষ করে মমতা বলেন, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য বিজেপিকে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়া। তার অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় শুধু ভোটাধিকার নয়, বাংলার মানুষের চাকরি, সম্মান এবং সাংবিধানিক অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সমাবেশে উপস্থিত বিরোধী নেতাদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তেজস্বী যাদব, কপিল সিব্বল, অভিষেক মনু সিংভি, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া সুলেসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে এক মঞ্চে এসেছেন। তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে মমতা বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্ব যুবসমাজকেই নিতে হবে। প্রয়োজন হলে অভিভাবক হিসাবে তিনি তাদের পথ দেখাবেন।

এনআরসি নিয়ে প্রশ্ন শশী থারুরের : কংগ্রেস সংসদ সদস্য শশী থারুর এনআরসি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্য, ভোটার তালিকা নির্ভুল হওয়া জরুরি। তবে একজন বা দুজন মৃত ভোটারের নাম থেকে যাওয়ার চেয়ে ১৩ কোটি প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়া অনেক বেশি বিপজ্জনক। এতে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সমাবেশে শিবসেনা উদ্ধব শিবিরের সংসদ সদস্য সঞ্জয় রাউত বলেন, সরকার পরিবর্তন চান মানুষ। সমাবেশে অংশ নিতে আসা লোকজনকে আটকানোর চেষ্টা হলে জমায়েত আরও বড় হবে।