প্রতি বছর ২৯ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। স্ট্রোক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, রোগের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা ও সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করাই দিবসটির মূল লক্ষ্য। স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় কারণ হলো উচ্চ রক্তচাপ। সারা বিশ্বে মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ মনে করা হয় স্ট্রোককে।

স্ট্রোক এমন একটি গুরুতর শারীরিক অবস্থা, যেখানে মস্তিষ্কে রক্তনালি বন্ধ হয়ে বা রক্তনালি ছিঁড়ে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। এতে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এবারের বিশ্ব স্ট্রোক দিবসের মূল বার্তা হলো ‘Every M1nute Counts’। অর্থাৎ স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্ট্রোক দিবস কেন পালন করা হয়?
স্ট্রোকের ভয়াবহতা, লক্ষণ, ঝুঁকির কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ২০০৬ সাল থেকে বিশ্ব স্ট্রোক দিবস পালন শুরু হয়।

অনেক সময় রোগী বা পরিবারের সদস্যরা স্ট্রোকের লক্ষণ বুঝতে পারেন না। কেউ কেউ লক্ষণগুলোকে সাধারণ সমস্যা মনে করে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। বিশ্ব স্ট্রোক দিবসে মানুষকে শেখানো হয় কীভাবে স্ট্রোকের লক্ষণ বুঝে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

স্ট্রোক কী এবং কেন হয়?
মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যেতে অবিরাম রক্ত সরবরাহ প্রয়োজন। কোনো কারণে এই সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে গেলে রক্তক্ষরণ হয়। এর ফলে স্ট্রোক হতে পারে।

স্ট্রোক প্রধানত দুই ধরনের। প্রথমটি হলো ইস্কেমিক স্ট্রোক। এটি মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে ঘটে। দ্বিতীয়টি হেমোরেজিক স্ট্রোক, যা মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণের কারণে হয়।

স্ট্রোকের লক্ষণ কী কী?
স্ট্রোকের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে থাকে না। এর লক্ষণ সাধারণত হঠাৎ করেই দেখা দেয়। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হলো-

• মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া।

• শরীরের এক পাশের হাত বা পা অবশ হয়ে যাওয়া।

• কথা জড়িয়ে যাওয়া।

• অন্যের কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া।

• হঠাৎ এক বা দুই চোখে ঝাপসা দেখা।

• হঠাৎ মাথা ঘোরা বা হাঁটতে অসুবিধা হওয়া।

তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই লক্ষণ দেখা যায় না। এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি।

স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করতে বিশ্বজুড়ে FAST পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।

F বা Face: আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসতে বলুন। মুখের এক পাশ বেঁকে যাচ্ছে কি না দেখুন।

A বা Arm: দুই হাত তুলতে বলুন। একটি হাত নিচে নেমে যাচ্ছে বা তুলতে পারছেন কি না খেয়াল করুন।

S বা Speech: কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কি না দেখুন।

T বা Time: এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা গেলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন।


বিশ্বে প্রতি ৬ সেকেন্ডে একজন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। বছরে আক্রান্ত হন প্রায় ৬ কোটি আর মারা যান প্রায় ২ কোটি মানুষ। স্ট্রোকের কারণে দেড় কোটি লোক পঙ্গু হচ্ছেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২০ লাখ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে আছেন ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের মধ্যে স্ট্রোকের প্রাদুর্ভাব ১১ দশমিক ৩৯ জন। আক্রান্তদের ৭৫ শতাংশের বেশি ইস্কেমিক স্ট্রোকে ভুগছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ময়মনসিংহে এ হার বেশি। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে স্ট্রোকের প্রাদুর্ভাব বেশি বলেও দাবি করা হয়েছে।

বাংলাদেশেও প্রতিবছর ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশন ২৯ অক্টোবর দিবসটি পালন করে আসছে। তবে এখনও পৃথকভাবে স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম না থাকায় বাংলাদেশ নিউরোলজি অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে দিবসটির আয়োজন করা হয়ে থাকে।