কোথাও বাঁশের ভিতরের লার্ভা ভাজা, কোথাও ধানখেতের জলজ পোকা-গবেষণায় মিলল ৭৫ প্রজাতির হদিস, ২৪টি বিশ্বে প্রথমবার ভোজ্য হিসেবে নথিভুক্ত, কিন্তু বন উজাড় ও বাজারের চাহিদায় বিপন্ন হতে পারে এই ‘খাদ্যভাণ্ডার’। গুবরে পোকা দেখলে অনেকেরই হয়তো গা শিরশির করে উঠবে। কেউ ঘরের কোণে দেখলে ঝাঁটা হাতে তেড়ে যাবেন, কেউ আবার খাবারের থালায় দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেবেন।

কিন্তু উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েকটি জনজাতি সম্প্রদায়ের কাছে এই পোকাই বহুদিনের পরিচিত খাবার! কোথাও বাঁশের ভিতরে থাকা লার্ভা আগুনে ঝলসে খাওয়া হয়, কোথাও ধানখেত বা জলাভূমি থেকে সংগ্রহ করা হয় জলজ পোকা। আর এবার বিজ্ঞানীদের গবেষণায় জানা গেল, এই অঞ্চলে মানুষের খাদ্যতালিকায় রয়েছে অন্তত ৭৫ প্রজাতির গুবরে পোকা ও উইভিল। তার মধ্যে ২৪টি প্রজাতিকে বিশ্বে প্রথমবারের মতো ভোজ্য হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।

প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকা এনপিজে এন্টোমোলজি-তে প্রকাশিত এই সমীক্ষা শুধু পোকা খাওয়ার বিচিত্র অভ্যাসের কথাই বলছে না, তুলে ধরছে বিকল্প প্রোটিনের সম্ভাবনাও। তবে এই সম্ভাবনার পাশেই রয়েছে সতর্কবার্তা-বন ধ্বংস, প্রাকৃতিক বাসস্থানের সংকোচন এবং বাজারে চাহিদা বাড়ার ফলে অতিরিক্ত সংগ্রহ এই পোকাগুলির অস্তিত্বের উপর চাপ তৈরি করতে পারে।

প্লেটে পোকা, প্রোটিনে চমক!
মুরগি, মাছ কিংবা ডালের বাইরে প্রোটিনের উৎস হিসেবে পোকামাকড়ের কথা শুনলে অনেকের ভুরু কুঁচকে যেতে পারে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পরীক্ষা করা চারটি প্রজাতির মধ্যে শুকনো ওজনের নিরিখে প্রোটিনের পরিমাণ ২২.৪৩ থেকে ৬১ শতাংশ পর্যন্ত।

নারকেল গণ্ডার গুবরে পোকা এবং বাঁশের উইভিলে প্রোটিনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি-শুকনো ওজনের ৪৬.৪৪ থেকে ৬১ শতাংশ। অন্যদিকে, পরীক্ষিত জলজ গুবরে পোকার ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ২২.৪৩ থেকে ২৩.২৩ শতাংশ। অর্থাৎ, সব পোকা সমান পুষ্টিকর নয়। কোন প্রজাতি খাওয়া হচ্ছে, তার উপর পুষ্টিগুণ নির্ভর করছে। গবেষণায় চর্বি, আর্দ্রতা, শক্তি এবং খনিজ উপাদানের মধ্যেও প্রজাতিভেদে পার্থক্য পাওয়া গিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে বিকল্প প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস হিসেবে কীটপতঙ্গ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। প্রচলিত পশুপালনে জমি ও জলের বিপুল ব্যবহার এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের কারণে বিজ্ঞানীরা বিকল্প খাদ্যসম্পদের সন্ধান করছেন। তবে উত্তর-পূর্ব ভারতের জনজাতি সমাজের কাছে এটি কোনও নতুন ফ্যাশন নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা খাদ্যসংস্কৃতিরই অংশ এই পোকা।

নাগাল্যান্ডে আঙ্গামিদের পাতে ৩১ রকম পোকা!
কোন সম্প্রদায় কত ধরনের পোকা খায়, সেই হিসাবেও রয়েছে চমক। সমীক্ষায় নাগাল্যান্ডের আঙ্গামি সম্প্রদায়ের খাদ্যতালিকায় মিলেছে ৩১টি প্রজাতি। অরুণাচল প্রদেশের নিয়িশি সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি ২৭। মণিপুরের মেইতেই সম্প্রদায়ের মধ্যে নথিভুক্ত হয়েছে সাতটি প্রজাতি। অনেক পোকা আবার মাত্র একটি সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাসেই দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ, এক অঞ্চলের মানুষের কাছে যা পরিচিত খাবার, অন্য অঞ্চলের মানুষের কাছে তা অচেনাই থেকে যেতে পারে।

বন, বাঁশঝাড়, ধানখেত ও জলাভূমি থেকে সংগ্রহ করা হয় এই পোকাগুলি। সব প্রজাতি সারা বছর পাওয়াও যায় না। কিছু স্থলচর গুবরে পোকা এপ্রিল থেকে নভেম্বরের মধ্যে বেশি মেলে। জলজ পোকা ও গণ্ডার গুবরে পোকা সাধারণত মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওয়া যায়। লংহর্ন বিটল বা লম্বা শুঁড়বিশিষ্ট গুবরে পোকার লার্ভা বর্ষার আগে ও বর্ষাকালে বেশি দেখা যায়।
রান্নার ধরনও এক নয়। কোথাও পোকা সেদ্ধ করা হয়, কোথাও ভাজা বা আগুনে ঝলসে নেওয়া হয়। স্থানীয় মশলা, এমনকি বাঁশকোঁড়াও ব্যবহৃত হয়। কোনও সম্প্রদায় পোকার নির্দিষ্ট অংশ খায়, আবার কোথাও গোটা পোকাটিই রান্না করে খাওয়ার রীতি রয়েছে।

খাবার থেকে লোকচিকিৎসা, অলংকারেও গুবরে পোকা!
পোকা খাওয়ার বাইরেও রয়েছে নানা লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ব্যবহার। নাগাল্যান্ডের আঙ্গামি সম্প্রদায়ের কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, লংহর্ন বিটলের লার্ভা নিউমোনিয়া, পেশির ব্যথা ও গাঁটের ব্যথার চিকিৎসায় ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহার করা হয়। মণিপুরের মাও সম্প্রদায়ের মধ্যে কাশি কমাতে এই লার্ভা দিয়ে ঝোল তৈরির প্রচলনের কথাও গবেষণায় উঠে এসেছে।
তবে লোকচিকিৎসায় কোনও কিছুর ব্যবহার নথিভুক্ত হওয়া মানেই তার চিকিৎসাগত কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত-এমন নয়।

নাগাল্যান্ডে রঙিন জুয়েল বিটলের সংরক্ষিত খোলস দিয়ে হার তৈরির রীতিও রয়েছে। উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পুরুষেরা এই অলংকার পরেন। কিছু গ্রামে আবার শিশুদের লংহর্ন বিটলের লার্ভা খেতে দেওয়া হলেও পূর্ণবয়স্ক পোকা খেতে দেওয়া হয় না। প্রচলিত বিশ্বাস, পূর্ণবয়স্ক পোকা খেলে শিশুর ঘাড়ের ক্ষতি হতে পারে। এই ধরনের রীতি দেখায়, পোকা ঘিরে খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও সম্পর্ক রয়েছে।

গাছ চিরে লার্ভা সংগ্রহ, বাজারে ৫০ টাকা পিস!
এত সম্ভাবনার মাঝেই রয়েছে বিপদের সংকেত। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া সংগ্রহকারীদের প্রায় ৭৯ শতাংশ জানিয়েছেন, গত এক দশকে কাঠের ভিতরে বসবাসকারী গুবরে পোকার প্রাপ্যতা কমেছে বলে তাঁদের মনে হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ বন উজাড় ও বাসস্থান ধ্বংসকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদের মতে, বাজারের চাহিদা মেটাতে অতিরিক্ত সংগ্রহও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করছে।

গবেষকেরা এমন পদ্ধতির কথাও নথিভুক্ত করেছেন, যেখানে কুড়ুল দিয়ে গাছ বা কাঠের গুঁড়ি চিরে লংহর্ন বিটলের লার্ভা বের করা হয়। প্রজাতি ও সংক্রমণের মাত্রা অনুযায়ী একটি গাছ থেকে ২০ থেকে ৪০টি লার্ভা পাওয়া যেতে পারে। পরে সেগুলি কাঠির সঙ্গে বেঁধে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়। নাগাল্যান্ডের কোহিমায় গবেষকেরা একটি লার্ভার দাম প্রায় ৫০ টাকা দেখেছেন।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। পোকার সংখ্যা কমে যাওয়ার এই হিসাব সংগ্রহকারীদের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি; গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের পোকার সংখ্যা কতটা কমেছে, তার সরাসরি বৈজ্ঞানিক পরিমাপ নয়।
কিছু কাঠখেকো পোকার সংগ্রহ বনাঞ্চলের ক্ষতিকর পোকা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সেই পোকা সংগ্রহ করতে গিয়ে যদি নির্বিচারে গাছ কাটা হয় বা কাঠের আবাসস্থল নষ্ট করা হয়, তা হলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হতে পারে।
পোকা থাকবে তো, নাকি একদিন শুধু গবেষণাপত্রেই মিলবে?

গবেষকদের পরামর্শ, ভোজ্য পোকার ব্যবহার বাড়াতে হলে আগে তাদের বাসস্থান রক্ষা করতে হবে। বন, বাঁশঝাড়, কৃষিজমি ও জলাভূমি সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রজাতির জীবনচক্র ও মরশুম বুঝে সংগ্রহ করা জরুরি। চাহিদা বাড়লে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রজনন ও লালনপালনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

এই কাজে জনজাতি সম্প্রদায় গুলিকে যুক্ত করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকেরা। কোন পোকা কখন পাওয়া যায়, কীভাবে সংগ্রহ করতে হয় এবং কোন পদ্ধতিতে রান্না করা হয়-এই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান তাঁদের কাছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত। সেই জ্ঞান নথিভুক্ত করার সময় সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের অধিকার ও সম্মতিকেও মর্যাদা দিতে হবে।

গুবরে পোকা নিয়ে এই গবেষণার আসল চমক তাই শুধু প্রোটিনের হিসাব নয়। যে খাবারকে অনেকে দেখেই এড়িয়ে যান, তা উত্তর-পূর্ব ভারতের বহু মানুষের কাছে পরিচিত খাদ্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু বাজারে তার দাম বাড়লে আর বন কমতে থাকলে, সেই ঐতিহ্যই বিপন্ন হতে পারে।