কক্সবাজারের উখিয়ায় পর্যটন এলাকা ইনানীতে গভীর নলকূপ খনন করতে গিয়ে ভূগর্ভ থেকে উচ্চচাপে গ্যাস ও তেল সদৃশ পদার্থ নির্গমনের ঘটনা ঘটেছে। উদগীরণ হওয়া এ গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের দাবি তুলছেন স্থানীয়রা। মাটির নিচে বড় ধরনের গ্যাসের মজুত থাকতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করছেন তাঁরা।
জানা গেছে, গত শনিবার (২৭ অক্টোবর) থেকে রোববার (১ নভেম্বর) পর্যন্ত উখিয়ার ইনানীতে মাটির নিচ থেকে অবিরাম গ্যাসের সঙ্গে আগুন বের হচ্ছে। পাশাপাশি সেখানে তেলের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে।
ইনানীর স্থানীয় বাসিন্দা আজিমুল্লাহ বলেন, টানা বেশ কয়েক দিন ধরে অনবরত মাটির নিচ থেকে প্রাকৃতিকভাবে গ্যাসের সঙ্গে আগুন বের হচ্ছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এখানে প্রচুর গ্যাসের মজুত থাকতে পারে। এ ধরনের ঘটনা খুব কমই দেখা যায়।
তিনি আরও বলেন, টানা এভাবে গ্যাস নির্গত হয়ে আগুন জ্বলতে থাকায় এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে দিন দিন শঙ্কা ও আতঙ্ক বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন বলেন, ইনানীতে পরিদর্শনে আসা বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলের কাছ থেকে জেনেছি, বর্তমানে মাটির নিচ থেকে নির্গত গ্যাসের সঙ্গে তেলের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে। এটি সবার জন্য একটি সুসংবাদ। গ্যাস ও তেল দুটিই জাতীয় সম্পদ। এ থেকে ধারণা করা যায়, এখানে মাটির নিচে বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও তেলের মজুত থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে যথাযথ অনুসন্ধান ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে তা জাতীয় পর্যায়ে এবং দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আরেক বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে উখিয়ার ইনানী ও সাগরসংলগ্ন এলাকায় তেল-গ্যাসের উপস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা প্রচলিত ছিল। এবার মাটির নিচ থেকে গ্যাসের সঙ্গে আগুন বের হওয়া এবং তেলের অস্তিত্বের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায়, সেই ধারণার বাস্তব নমুনা দেখা গেল। তবে প্রকৃত মজুত নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, মাটির নিচ থেকে গ্যাসের সঙ্গে বের হওয়া আগুন সাময়িকভাবে বন্ধ করলেই হবে না। এখান থেকে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস ও তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
আরও জানা গেছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) উচ্চপর্যায়ের একটি যৌথ বিশেষজ্ঞ দল উখিয়ার ইনানীর ঘটনাস্থলে আগুনের প্রকৃতি, গ্যাস নিঃসরণের তীব্রতা এবং পারিপার্শ্বিক ভূতাত্ত্বিক বিন্যাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার বর্তমান কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছে। তাঁদের প্রাথমিক ধারণা, নির্গত গ্যাসটি থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক প্রকৃতির হতে পারে। এমনকি আগুনের শিখার রং দেখে ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাসের সঙ্গে তরল তেল বা কনডেনসেট মিশ্রিত রয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশে সচরাচর মাটির দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের মজুত মেলে। তবে ইনানীর ক্ষেত্রে এটি অগভীর কোনো রিজার্ভার হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। গ্যাসের প্রকৃত উৎস ও মজুত নির্ধারণে আগামী ১৫ দিন আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাসের চাপ পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এই সময়ের মধ্যেও যদি আগুনের তীব্রতা অপরিবর্তিত থাকে বা বৃদ্ধি পায়, তবে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ‘রিলিফ কূপ’ খনন করে গ্যাস নির্গমন পুরোপুরি আটকে দেওয়া হবে, যা আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের দুর্যোগে স্বীকৃত একটি পদ্ধতি। আর যদি নির্গমন নিজে থেকেই কমে বা বন্ধ হয়ে যায়, তবে পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ইনানীতে গ্যাস নির্গমনের ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের চলাচল ও অবস্থানের ওপর ১৪৪ ধারা জারি আছে। এ নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে সব ধরনের আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দিয়াশলাই ও লাইটার ব্যবহারসহ স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে, এমন সব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন আব্দুল্লাহ নামে এক ব্যক্তির বসতবাড়িতে নলকূপ স্থাপনের জন্য প্রায় এক হাজার ফুট গভীর বোরিং করা হয়েছিল। পরে শনিবার (২৭ অক্টোবর) সকালে ওই বোরিং থেকে তীব্র বেগে গ্যাস নির্গত হতে শুরু করে। একপর্যায়ে গ্যাসে আগুন ধরে যায়।
এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। তবে ভূগর্ভ থেকে অবিরাম গ্যাস নির্গত হতে থাকায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে বাপেক্সের একটি কারিগরি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতির প্রাথমিক মূল্যায়ন করে।