পুরান ঢাকার এক বাড়ি আর অদ্ভুতুড়ে খাবার ঘর নিয়ে লিখেছেন সৈয়দ রাইয়ান আমির

মা গল্পটা দিনের বেলা বলতে পারেন শুধু। শুনেছি হয়তো হাজারবার। আমার শুনতে ভয় না লাগলেও আমার মায়ের এই গল্প বলতে বেশ বেগ পেতে হয়। চকবাজারের সেই বাড়িটি আমি দেখেছি। মানে ওখানে বানানো নতুন বাড়িটি। আমার মা সৈয়দা রাহনুমা ফেরদৌসের কাছে শুনেছি, আগেরটা প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো ছিল। পনেরো ইঞ্চি পুরু দেয়াল, মাথার অনেক ওপরে কড়িবরগা, কাঠের ভারী দরজা। দরজার নিচের দিক ফুলে গিয়েছিল। বর্ষায় বন্ধ করতে দুই হাতে ঠেলতে হতো, খুললে মেঝেতে ঘষা খেয়ে এমন শব্দ উঠত যে পাশের ঘরের ঘুমন্ত মানুষও জেগে যেত। 

বাড়ির মাঝখানে ছিল খাওয়ার ঘরটা। বাইরের আলো সেখানে সরাসরি পৌঁছাত না। দুপুরে অন্য ঘরগুলোর বাতি নিভিয়ে রাখা গেলেও ওই ঘরে কিছু খুঁজতে গেলে বাতি জ্বালাতে হতো। মেঝে মোছার পর শুকাতে চাইত না। চেয়ার সরালে পায়ার নিচে জমে থাকা ভেজা ধুলোর কালচে দাগ দেখা যেত। আর একটা গন্ধ ছিল। মা বলেন, বাসি পোলাওয়ের মতো। হাঁড়ির ঢাকনা খুললে পরদিন সকালে যে মিষ্টি, একটু টক হয়ে আসা গন্ধ পাওয়া যায়, অনেকটা তেমন। ঘরটায় খাবার না থাকলেও গন্ধটা পাওয়া যেত।

বাড়িটি মায়ের নানু কিনেছিলেন দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের কাছ থেকে। চলে যাওয়ার দিন ভদ্রলোক খাওয়ার ঘরটা পরিষ্কার রাখার কথা বলেছিলেন। রোজ মুছতে হবে। গোলাপজল ছিটাতে হবে। সন্ধ্যায় আগরবাতি দিতে হবে। ওই ঘরে নিয়মিত নামাজ পড়তে হবে।

মা বলতেন, ওই ঘরের কাজ শেষ করার সময় একটা অদ্ভুত তাড়া লাগত। বালতি তুলে নিতে গিয়ে মনে হতো, পেছনে কিছু ফেলে এসেছেন। ফিরে তাকালে কিছুই নেই। তবু বেরিয়ে আসার পর আবার মনে হতো, আরেকবার দেখা দরকার। মা কখনো দ্বিতীয়বার দেখতেন না। নিষেধ ছিল, সবাই মেনে চলে, এখনো।

পুরনো খাওয়ার ঘরটা যেখানে ছিল, নতুন বাড়ির একটা ঘরের কিছু অংশ ঠিক সেখানে পড়েছে। মাঝেমধ্যে সেই ঘরে পোলাওয়ের গন্ধ পাওয়া যায়। বাড়ির সবাই যে অবশ্য একই জিনিস অনুভব করতেন, তা নয়। কেউ রাতে দরজার ওপাশে পায়ের শব্দ শুনতেন। সকালে বললে অন্য কেউ বলতেন, ‘আমি বাথরুমে গেছিলাম।’

কথাটা সেখানেই শেষ হয়ে যেত।

স্বপ্নগুলোর কথাও প্রথমে এভাবে শেষ করার চেষ্টা হয়েছিল।

একজন দেখতেন, খাওয়ার ঘরে অনেক লোক বসে আছে, অথচ কাউকে চেনা যাচ্ছে না। আরেকজন দেখতেন, তিনি ঘরটা মুছছেন, কিন্তু মেঝের একটা অংশ কিছুতেই পরিষ্কার হচ্ছে না।

মায়ের স্বপ্নে শুধু একজন এসেছিল। সেটি স্বপ্নই ছিল কি না, এত বছর পরও মা নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। তার মনে আছে, তিনি বিছানায় শুয়েছিলেন। তারপর কোনো মাঝের ঘটনা ছাড়াই দেখলেন, খাওয়ার ঘরে দাঁড়িয়ে আছেন।

ঘরের বাতি নেভানো। তবু টেবিলটা দেখা যাচ্ছে। টেবিলের ওপাশে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে।

মহিলা বললেন, ‘তুমি এখানে কী করো?’

মা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমরা এখানে থাকি।’


মহিলা চুপ করে রইলেন।

মায়ের মনে হলো, উত্তরটা ঠিক হয়নি। তাই আবার বললেন, ‘আমার নানু এই বাড়ি কিনেছে।’

মহিলা শুধু দাঁড়িয়ে রইলেন। যেন মা কথা শেষ করেননি। যেন আসল উত্তরটা এখনো দেওয়া বাকি।

ঘুম ভাঙার পর মা দেখলেন, তার মুখ খোলা। গলা এত শুকিয়ে গেছে যে ঢোক গিলতে ব্যথা হচ্ছে। পাশের মানুষটাকে ডাকতে গিয়ে প্রথমবার কোনো শব্দ বেরোয়নি।

সকালবেলা ঘটনাটা শুনে আমার নানা বলেছিলেন, বোবায় ধরেছিল।

আরেকজন জানতে চেয়েছিলেন, আগের সন্ধ্যায় ঘরে আগরবাতি দেওয়া হয়েছিল কি না।

কয়েক রাত পর পাতিলের শব্দ শুরু হলো। প্রথমে একবার। ঠং।

মায়ের ঘুম ভেঙে গেল। তিনি শুয়েই রইলেন। পুরনো বাড়িতে কত রকম শব্দ হয়। কাঠে শব্দ হয়, ছাদে বিড়াল ওঠে, পাশের বাড়ির শব্দও কখনো নিজের বাড়ির বলে মনে হয়।

তারপর আবার। ঠং। ঠং।

এবার পাশে শোয়া আমার খালাও উঠে বসলেন।

শব্দটা খাওয়ার ঘর থেকে আসছিল।

বড় ডেগের কিনারে ধাতব কাফগির ঠুকে ঝাড়লে যে আওয়াজ হয়, ঠিক সেটি। পরপর কয়েকবার বাজে। একটু থামে। তারপর আবার।

খাওয়ার ঘরের দরজায় তালা দেওয়া ছিল। চাবি কোথায়, মা জানতেন। আর ঘরে কোনো ডেগ ছিল না।

পাশের ঘর থেকে একজন কেশে উঠলেন। তারপর কাউকে ফিসফিস করে ধমক দিতে শোনা গেল, ‘চুপ। শুয়ে থাকো।’

পানির জগ ছিল খাওয়ার ঘরে। কেউ আলো জ্বালালেন না। তারপর পোলাওয়ের গন্ধ এলো। আগের সেই বাসি গন্ধ নয়। সদ্য চুলা থেকে নামানো পোলাও। ঘি, গরম চাল, ভাজা পেঁয়াজ। পাশের ঘরে কে যে আবার পানি চাইল। এবার একটু জোরে। সঙ্গে সঙ্গে শব্দ থেমে গেল।

মায়ের পাশে আমার খালা বিছানার চাদর মুঠো করে ধরেছিলেন। কারও নড়াচড়ার শব্দ নেই। সবাই চুপ।

সেই নীরবতার মধ্যে তার মনে হয়েছিল, বন্ধ দরজার ওপাশে কেউ কাজ থামিয়ে শুনছে।

একসময় বাইরে মানুষের চলাফেরা শুরু হলো। সকাল হলো।

খাওয়ার ঘর খুলে কিছু পাওয়া যায়নি। সেদিন ঘরটা অন্য দিনের চেয়ে আগে মোছা হয়েছিল। বাড়িতে এরপরও অনেক বছর মানুষ থেকেছে। বিয়ে হয়েছে, বাচ্চা হয়েছে। খাওয়ার ঘরের টেবিলে বসেই ভাত খেয়েছেন সবাই। ওই রাতের কথা দুপুরবেলায় তুললে কেউ কেউ হাসতেন। কিন্তু সন্ধ্যায় আগরবাতি দিতে ভুল হলে সেই মানুষগুলোরই একজন মনে করিয়ে দিতেন।

পুরনো বাড়িটা পরে ভেঙে ফেলা হয়। সেখানে এখন তিনতলা দালান। টাইলসের মেঝে, বড় জানালা, হালকা দরজা। সুইচ চাপলে ঘরের প্রতিটি কোণ দেখা যায়।

পুরনো খাওয়ার ঘরটা যেখানে ছিল, নতুন বাড়ির একটা ঘরের কিছু অংশ ঠিক সেখানে পড়েছে। মাঝেমধ্যে সেই ঘরে পোলাওয়ের গন্ধ পাওয়া যায়।

মাঝেমধ্যে ধাতব শব্দও শোনা যায়। পাইপের শব্দ হতে পারে। ঘরটা রোজ মোছা হয়।

একদিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আচ্ছা, তোমরা কি জানো, এই নিয়মগুলো প্রথম কে চালু করেছিল?’

মা বললেন, ‘বড়রা বলে গেছেন।’

‘তারা কেন করতে বলতেন?’

মা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর বললেন, ‘খামাকা কে ভেজাল সামলাবে।’

কথাটা এমনভাবে বললেন, যেন বহুদিন আগে মুখস্থ করা একটা উত্তর মনে করে বলছেন।

সেদিন গল্প করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। আমরা তখন নানু বাসায়। মা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। আমি বললাম, ‘কী হলো?’

‘ঘরটা মুছছে কি না দেখে আসি।’

‘না মুছলে কী হবে?’

মা দরজার কাছে থামলেন। আমার দিকে তাকালেন না।

আমিও গেলাম পেছন পেছন। দেখি ঘর মোছা, চকচকে মেঝে।

আমার মাথায় এলো, ভালোই হয়েছে, ‘খামাকা কে ভেজাল সামলাবে।’