দিনভর রিকশা-ভ্যান চালিয়ে যে টাকা আয় হয়, তা দিয়ে সংসারের খরচ মেটানোই কঠিন। এর মধ্যে মাছ-মাংসের দাম বাড়লে খাবারের তালিকা ছোট করা ছাড়া উপায় থাকে না। সাতক্ষীরা শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে এখন বাজার করা মানেই আয়-ব্যয়ের কঠিন হিসাব। কেউ মাছের বদলে কম দামের অন্য খাবার কিনছেন, কেউ আবার প্রয়োজন থাকলেও মাছ-মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। ফলে তাদের পাতে প্রোটিন পড়ছে না, পুষ্টি চলে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। তাই নিয়মিত তদারকি ও ক্রয়-বিক্রয়ে স্বচ্ছতার দাবি তুলেছেন ক্রেতারা।

২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার পর শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়ন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে সাতক্ষীরা শহরে আসা এক ব্যক্তির জীবনেও রয়েছে টিকে থাকার লড়াই। জীবিকার জন্য প্রতিদিনের আয়ের ওপরই নির্ভর করতে হয় তাকে। শহরের এক রিকশা-ভ্যানচালককেও আয় থেকে গাড়ির খরচ বাদ দিয়ে পরিবারের খাবারসহ অন্যান্য ব্যয় মেটাতে হয়।

এক বিধবা নারী অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালান। আরেক নারী অসুস্থ স্বামী, তিন সন্তান ও প্রতিবন্ধী বড় ছেলেকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবার সামলাতে অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। সীমিত আয়ে প্রয়োজন মেটাতে তাদের প্রতিদিনই হিসাব করে চলতে হয়। বাজারে মাছ-মাংসের দাম বাড়লে সেই হিসাব আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

মাছের দাম বেড়েছে কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা

সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর মাছবাজার ও সবজির বাজারে সরেজমিনে জানা গেছে, বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম আগের তুলনায় কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, পাইকারি বাজারে মাছ খুচরার তুলনায় কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কম দামে বিক্রি হচ্ছে।

সুলতানপুর মাছবাজারে আকারভেদে রুই ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা, ভেটকি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, চন্দনা ইলিশ ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং চিংড়ি ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া তেলাপিয়া ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, পাঙাশ ২০০ থেকে ২২০ টাকা, কাতলা ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা, ট্যাংরা ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা, ছোট মাছ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, পারশে ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং কই ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি।

বাজার করতে আসা ক্রেতা নাজমুল হাসান বলেন,  আগে যে টাকা নিয়ে বাজারে আসতাম, এখন সেই টাকায় আগের মতো মাছ-মাংস কেনা যায় না। মাছের দাম বেশি হওয়ায় পরিমাণ কমিয়ে কিনতে হচ্ছে। সংসারের অন্য খরচ মিটিয়ে খাবারের জন্য বাড়তি টাকা জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিক্রেতা হাফিজা খাতুন বলেন, মাছের ধরন ও আকার অনুযায়ী দাম আলাদা। পাইকারি বাজার থেকে যে দামে মাছ কিনতে হয়, তার সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ হয়। তাই কেনা দাম বাড়লে খুচরা বাজারেও দাম বাড়ে। তবে দাম বেশি হলে ক্রেতারা আগের তুলনায় কম মাছ কেনেন।

মাংস ও ডিম

বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা, সোনালি মুরগি ২৪০ টাকা এবং লেয়ার মুরগি ২৩০ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস কেজি ৭৫০ টাকা, খাসির মাংস ১ হাজার ১৫০ টাকা। আগের তুলনায় মাংসের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বাজারে লাল বা বাদামি ডিম প্রতিটি ১১ টাকা, সাদা ডিম ১০ টাকা ৫০ পয়সা, হাঁসের ডিম ১৬ টাকা ৫০ পয়সা এবং কোয়েলের ডিম ৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দরে পরিবর্তন হয়নি।

পেঁয়াজের দাম বেড়েছে, কমেছে বেগুনের

সুলতানপুর সবজির বাজারে স্থানীয় পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৫ দিন আগে দাম ছিল ৪০ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে ১০ টাকা বা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। রসুন বিক্রি হচ্ছে কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। তবে কিছু সবজিতে ক্রেতারা তুলনামূলক স্বস্তি পাচ্ছেন। বেগুন এখন কেজি ৭০ টাকা, যা তিন মাস আগে ছিল ১০০ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে দাম কমেছে ৩০ টাকা বা ৩০ শতাংশ। করলা বিক্রি হচ্ছে কেজি ৬০ টাকায়।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মেহেদী হাসান তানভীর বলেন, অধিদপ্তর সাতক্ষীরা জেলায় নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাজার তদারকির পাশাপাশি ভেজাল পণ্য বিক্রি এবং সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা এসএম আব্দুল্লাহ বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মনিটরিংয়ের পাশাপাশি অতি মুনাফা না করে ক্রয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে সমন্বয় রাখতে বিক্রেতাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।